সকল ধর্মের একটিমাত্র উপদেশ:
ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী
অনেকে সুফি দর্শন লিখতে গিয়ে এমন-এমন এবং মারাত্মক ভুল করে বসেন যা তাদের জানা নাই। প্রতিটি মানুষের নফ্সের সঙ্গে যে খান্নাসরূপী শয়তানটিকে আল্লাহ্ পাক পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছেন উহাকে তাড়িয়ে দেবার কথাটি বেমালুম ভুলে গিয়ে নফ্সকেই তাড়িয়ে দেবার কথাটি লিখে বসে। নফ্স মানে হলো আমি, কিন্তু খান্নাসরূপী শয়তানটি মোটেও আমি নহে। সুতরাং আমি তথা আপন নফ্স পবিত্র, কিন্তু আপন নফসের সঙ্গে যে খান্নাসরূপী শয়তানটি পরীক্ষা করার জন্য দেওয়া হয়েছে উহা অপবিত্র এবং উহাকেই আমিত্ব বলা হয়। উহাকেই অন্য ভাষায় হাস্তি, খুদি, ইগো, অহম ইত্যাদি নাম দেওয়া হয়েছে। এই খান্নাসরূপী শয়তানটিকে প্রাচীন কালের মুনি-ঋষিরা খান্নাস না বলে মায়া বলতেন। এই মায়াই বন্ধন। সুতরাং আমার কর্ম তখনই বন্ধন হয়, যখন আমার কর্মের উপর খান্নাস তথা মায়া নামক বিষয়টি ভর করে। অন্যথায় কর্ম বন্ধন নয় বরং ইবাদত। এই খান্নাস তথা মায়াকে পরিত্যাগ করার জন্যই এত ধর্মের উপদেশ, এত ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এত ধর্মীয় চিল্লাচিল্লি, এত ধর্মীয় ওয়াজ-নসিহত, এত ধর্মীয় গজল আর কাওয়ালির কান্নাকাটি ইত্যাদি।

প্রতিটি ধর্মীয় উপদেশের একমাত্র উদ্দেশ্যটি হলো, আপনার ভেতর যে খান্নাস তথা মায়াটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে উহা হতে পরিত্রাণ লাভ করা। এই একটিমাত্র উপদেশ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপদেশ ধর্মীয় দর্শনে আছে বলে আমার মনে হয় না। খাবার প্লেটটি যতই সুন্দর ও যতই দামি হোক না কেন, যদি সামান্য ধুলাবালিও ঐ প্লেটে থাকে তো পরিষ্কার করেই প্লেটে খাদ্য রাখা হয়। তদ্রুপ মানুষের দিলের প্লেটটি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর রহমত ঢেলে দেবার প্রশ্নই উঠে না। দিলের প্লেটটি যখন খান্নাস নামক ময়লায় আচ্ছন্ন থাকে তখন আল্লাহর রহমত ঢেলে দেবার বিধান রাখা হয় নি। দিলের অপরিষ্কার প্লেটটির নাম হলো নফসে আম্মারা। সাধক যখন দিলের প্লেটটি পরিষ্কার করার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যায় তখন দিলের প্লেটের নাম হয় নফসে লাউয়ামা তথা সংগ্রামরত নফ্স, জেহাদে লিপ্ত নফ্স। যখন দিলের প্লেটটি একদম পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন হয়ে যায় তখনই দিলের প্লেটটি নামধারণ করে নফসে মোতমায়েন্না তথা পরিতৃপ্ত এবং পবিত্র নফ্স।
আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিরাজ্যে মাত্র দুইটি স্থানে জাতরূপে তথা খাসসুল খাসরূপে অবস্থান করেন। একটি জিনের অন্তর এবং অপরটি মানুষের অন্তর। এই দুইটি অন্তর ছাড়া সর্বস্থানে আল্লাহ্পাক সেফাতরূপে বিরাজ করেন। সৃষ্টিরাজ্যের বাহিরে লা-মোকামে আল্লাহর অবস্থানটির কথা সবাই কম-বেশি জানে, কিন্তু জিনের অন্তর এবং মানুষের অন্তরেও যে তিনি জাতরূপে অবস্থান করেন সেটা অনেকেই বুঝতে পারে না। ‘আমরা তোমাদের জীবন রগের নিকটেই আছি’, এই নিকটে থাকাটাতেই জাতরূপে থাকার কথাটি বলা হয়েছে। কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না। বোঝাটাও তকদির, না বোঝাটাও তকদির। সুতরাং পূর্বজন্মের কর্মফল দ্বারাই তকদিরটি নির্ধারণ করা হয়।
-মারেফতের গোপন দর্শন অনেকেরই অজানা
-ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী
















