“আহাদ” শব্দটি একক আর “ওয়াহেদ” শব্দটি হল “এক”। একক এবং একের মাঝে পার্থক্য আছে। কারণ আহাদ না বলে ওয়াহেদ বলতে পারতেন। অখণ্ড ও অদ্বিতীয় সত্তার একমাত্র বিশাল অস্তিত্বকে বুঝতে হলে আহাদ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ওয়াহেদ শব্দটি কেবলমাত্র ‘এক’কে বুঝায় বলে পার্থক্যটি দেখা দেয়। আল্লাহ যখনই প্রকাশিত হতে ইচ্ছা করলেন তখনই আহাদ রূপটি তাঁর ধারন করতে হয়। প্রকাশ না করার ইচ্ছা থাকলে তিনি ওয়াহেদ। কোরানের ত্রিশ নম্বর সূরা রূমের ত্রিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে “তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহি” তথা “আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও”। তাই সৃষ্টির মাঝে কোন শেরেক থাকতে পারে না।
সৃষ্টির মাঝে শেরেক থাকলে আল্লাহর গুণে মানুষ কখনোই গুণান্বিত হবার প্রশ্নই উঠে না। কারণ সৃষ্টি তৌহিদে বাস করে। আর শেরেক বাস করে মনে। মনই শেরেকের গুদাম ঘর। মনই শেরেকের রাজধানী। তাই মন হতে শেরেক দূর করে দিয়ে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হবার উপদেশ দিচ্ছে কোরান। ভুল, মিথ্যা এবং মায়া মনটিকে শেরেকের আবর্জনায় কলুষিত করে। এই শেরেকের আবর্জনার সামান্যতম অণু-পরমাণুটিও সৃষ্টিতে নেই এবং থাকার বিধান রাখা হয়নি। এজন্যই মনের অজান্তে আহাদ ও ওয়াহেদের পার্থক্যটি বুঝতে না পেরে এক করে ফেলি এবং একই রকম অনুবাদ করি। তাই মানুষের মনের আমিত্বটি কোরবানী করতে পারলেই এই ভুল বোঝার অবসান হয়।
আহাদ অদ্বিতীয় অখণ্ড সত্তা বলেই কুফু তথা মেশাল দেবার কিছুই নাই। মেশাল থাকলে তো কুফু করতে চাইবে। কিন্তু অনস্তিত্ব কেমন করে কুফু করে। কারণ অনস্তিত্ব সৃষ্টিতে অবস্থান করে না। এটা মনের একটি মায়াবী ধারণা। যে ধারণার মেশাল তথা কুফু নাই। সেটা কেবল শব্দ ও মনেই অবস্থান করে। তাই জগতসমূহের রবেরই প্রশংসাটি একমাত্র প্রশংসায় পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠিত প্রশংসা বলা ও শিখাটা মারাত্মক ভুল। শুনতে ভালই লাগে, কিন্তু ভুল শিক্ষার পথ খোলা করে দেওয়া হয়। কারণ অখণ্ড অস্তিত্ব ছাড়া যে আর কিছুই নাই। নাই-এর প্রশংসা করা যায় না। ‘আছে’-র প্রশংসা করা যায়। ‘নাই’-এর প্রশংসা একমাত্র মন করতে পারে। কারণ মনই কেবল আজব আজব কল্পনা করতে পারে। মন জানে নাই তবু অকারণে নাই এর প্রশংসা করতে চায়। মন জানে নাই-এর প্রশংসা করাটাই একটি আত্মবিরোধ, একটি ডাহা গরমিল, একটি প্রচ্ছন্ন ছলনা, তবু এই ছলনার মাঝে অকারণেই ডুবে থাকতে ভালবাসে।
নাস্তিক্যবাদ বলে কিছুই নাই তবু মন বক বক করে নাস্তিক্যবাদের কথা বলবে, নাস্তিক্যবাদের যুক্তিতর্ক খাড়া করবে, নাস্তিক্যবাদের গান গাইবে, নাস্তিক্যবাদের ফ্যাশনে গা ভাসিয়ে দিয়ে অহংকার করবে, নাস্তিক্যবাদকে জ্ঞান মাপার কাল্পনিক যন্ত্র মনে করবে। সে হয়তো জানে নাস্তিক্যবাদ বলে কিছুই নাই তবু মন মায়ার খপ্পরে পড়ে বক বক করতেই থাকবে। এটা কোন মানসিক রোগ কিনা জানিনা। এটা এক ধরনের ফ্যাশন কি-না জানি না। এটা অস্তিত্বের উপর জ্ঞান গবেষণার অভাব কি-না জানি না।
সুতরাং অস্তিত্বের রহস্যটি বুঝতে পারলেই আহাদের উপর কুফু করার প্রশ্নই উঠে না। কারণ কুফু মানেই মেশাল। অতি সাধারণ দৃষ্টিতে সূর্যের মেশাল তথা কুফু করা যায় না। কারণ আর একটি সূর্যের অস্তিত্ব এই সৌর জগতে নাই। তাই মেশাল তথা কুফু করার প্রশ্নই উঠে না। তেমনি অখণ্ড অদ্বিতীয় সয়ম্ভু আহাদ সত্তার বাইরে কিছু নাই।
নাই দিয়ে মেশাল তথা কুফু করা যায় না। দৃষ্টি ও দর্শনের মাঝে মায়ার আমিত্ব কল্পনা করতে ভালবাসে, তাই কুফু করে বসে আমিত্বের মায়ার বন্ধন। সাধনার মাধ্যমে তথা মোরাকাবা মোসাহেদার মাধ্যমে এবং আল্লাহর বিশেষ রহমতে সাধক যখন আমিত্বের বন্ধন ছিন্ন করতে পারে তখনই কুফু এবং আহাদের রহস্যটি বুঝতে পারেন।
[ সুফিবাদ আত্মপরিচয়ের একমাত্র পথ ]
-ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী
















