Sufi meditation বা ধ্যান সাধনা
(৩য় কিস্তি)
নফস আমি, রূহ আমি নই। নফস আমি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করব, রূহ কখনো মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে না, কারণ রূহ সৃষ্টি নয়, বরং জাত তথা আল্লাহ্। যেহেতু নফস আমি মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করব, সেহেতু নফসের মাগফেরাত চাইতে হয়। যেহেতু রূহ স্রষ্টা এবং রূহ কখনো মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে না, সেহেতু রূহের মাগফেরাত চাওয়া যায় না। যারা রূহের মাগফেরাত চায় তারা মনের অজান্তে বিরাট ভুলটি করে থাকে। যে রূহ মৃত্যুর স্বাদই গ্রহণ করে না, সেই রূহের মাগফেরাত চাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এই সামান্য বিষয়টিতেও আমরা ভুল করতে দেখি। এই সামান্য বিষয়টি যারা জানে না তারা কেমন করে বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ হয়?
আল্লাহর মধ্যে কথা নাই, কথার মধ্যে আল্লাহ্ নাই। যখন আল্লাহ্ কথা বলেন, তখন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সেফাতরূপী মানুষের মুখ দিয়েই কথা বলেন। সুতরাং মানুষ যে রকম আল্লাহর রহস্য, সে রকম আল্লাহ্ও মানুষের রহস্য। ইহার দলিল আছে, তবে বিবেকের জ্ঞানীদের কাছে এর দলিলের দরকার হয় না। মোটামুটিভাবে দুনিয়ার একটি উপমা তুলে ধরা যায়। যৌন বিশেষজ্ঞরা একটি কথা বলে থাকেন যে, যৌন মিলনের চরম মুহূর্তে কারো পক্ষে একটি বাক্যও শুদ্ধ করে বলা সম্ভবপর নয়। সুতরাং রূহরূপী আল্লাহ্ যখন সাধকের ভিতর উদ্ভাসিত হয়, তখন রূহ কথা বলে; যদিও সাদা চোখে আমরা দেখতে পাই যে মানুষটি কথা বলছে। তাই অলীরা বলে থাকেন যে, যার কথা সে-ই বলছে, মানুষটি তো কেবলমাত্র একটি বাহানা। তাই কোরান বলছে যে, মহানবী নিজ হতে একটি কথাও বলেন নি, বরং আল্লাহ্ যা বলেছেন তা তিনি বলে গেছেন। যেহেতু প্রতিটি মানুষের সঙ্গে আল্লাহ্ পাক খান্নাসরূপী শয়তানকে পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছেন, সেইহেতু আবু জাহেল, আবু লাহাব, ওকবা, সায়বা এবং আবদুল্লাহর মত প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ মানুষগুলো কোনো কালেই এই কথাগুলো গ্রহণ করে নিতে পারেন নি, পারে না এবং পারবেও না। যত প্রকার উপমা এবং দলিলই দেখানো হউক না কেন, এই জাতীয় প্রচণ্ড সন্দেহবাদীরা বিনাবাক্যে মেনে নিতে পারে না; ইহাই তাদের তকদির, যাহা পূর্বজন্মের কর্মফল বলে প্রাচীন কালের মুনি-ঋষিরা বলে গেছেন। অবশ্য এ কথাটিও আংশিক সত্য বলে ধরে নিতে চাই যে, তথাকথিত মানব সভ্যতার সৃষ্টি একদিনে হয়নি বরং ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। এই তথাকথিত মানব সভ্যতার অবদান কেবলমাত্র মানুষের নয়, বরং খান্নাসরূপী শয়তানের অবদান অস্বীকার করার জো নেই বলে মনে করি। হজরত দাউদ (আ.) এবং হজরত সোলায়মান (আ.) যে বায়তুল মুকাদ্দাস তৈরি করেছিলেন ইহাতে খান্নাসরূপী শয়তানের যে অবদান আছে ইহা কোরানেরই ঘোষণা। শয়তান কেবলমাত্র আত্মদর্শনের ধ্যানসাধনা হতে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে। কারণ শয়তান ভাল করেই জানে যে, যে তার নফসের পরিচয়টি জানতে পেরেছে, সে তাঁর রবরূপী আল্লাহর পরিচয়টি জানতে পেরেছে। সুতরাং শয়তান ভাল করেই জানে যে, আত্মদর্শনেই রবের দর্শন হয়, এবং এই আত্মদর্শনের পথ হতে ফিরিয়ে রাখাটাই শয়তানের ধর্ম; কারণ শয়তানকে বলতে শুনি যে, সে আল্লাহকে পরিপূর্ণরূপে ভয় করে। শয়তান আল্লাহকে মানে, কিন্তু আদমকে মানে না, মেনে নিতে পারে না এবং মেনে নেবার ধর্মটি শয়তানের নেই। ইহাই শয়তানের অভিশপ্ত তকদির।

এখন বিরাট প্রশ্নটি হল যে, মোরাকাবা-মোশাহেদার ধ্যান সাধনাটি কেমন করে এবং কী উপায়ে এবং কী পদ্ধতিতে করলে আপনার অভ্যন্তরে রবরূপী আল্লাহ্ উদ্ভাসিত হবে? এখানেই পীরের প্রয়োজন, এখানেই গুরুর প্রয়োজন। গু মানে অন্ধকার, রু মানে আলো। সুতরাং যিনি অন্ধকার হতে আলোর পথ দেখিয়ে দেবেন তিনিই গুরু, তিনিই তো পীর। অবশ্য গুরু তথা পীর ধরার আগে তথা মুরিদ হবার আগে এই শর্তটি অবশ্যই থাকতে হবে যে, আপনার দেখানো এবং শিখানো মোরাকাবার ধ্যানসাধনায় যদি রহস্যলোকের কোন নিদর্শন দেখতে না পাই তাহলে আপনাকে পরিত্যাগ করে অন্য গুরু তথা পীর ধরতে বাধ্য হব। কারণ পীর ধরাটি এখানে আসল বিষয় নয়, বরং রহস্যলোকের রহস্য দর্শন করাই একমাত্র উদ্দেশ্য। তাই আমরা আগের দিনের অলীদেরকে দেখতে পাই যে, শর্তযুক্ত চুক্তিভিত্তিক মুরিদ হয়েছেন। আজ সেই বিষয়টির গুরুত্ব অনেকখানি কমে গেছে। আরও অবাক লাগে যে, এই শর্তযুক্ত মুরিদ হবার কথাটি শুনলে পীর সাহেবেরা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন। অনুষ্ঠান করে যাও, ওয়াজ-নসিহত শুনে যাও, ইত্যাদি তাগিদ দেওয়া হয়; কিন্তু মোরাকাবা-মোশাহেদার ধ্যানসাধনার কথাটি বলা হয় না। অবশ্য আজকের বেশির ভাগ মুরিদদের মোরাকাবার ধ্যানসাধনা করার আগ্রহটিও দেখা যায় না। সুতরাং ‘রূহ আন মান ফেরেস্ত’ তথা যেমন মানুষ তেমন পীর। তা ছাড়া মুরিদদের সংখ্যা দিয়ে পীরের গুণ নির্ণয় করা হয়। আমার পীর কুতুবুল আখতার, আমার পীর দরবেশ, আমার পীর গাউসুল আজম বলাটি অবশ্যই ভাল এবং শোভনীয়, কিন্তু আমি কী পেলাম, আমি কী জানলাম, আমি কী বুঝলাম, আমি রহস্যলোকের কী পরিচয় পেলাম ইত্যাদি প্রশ্নগুলো যাদের বিবেকের দরজায় আঘাত করতে থাকবে, তারা অবশ্যই সত্য-সুন্দর পথে এগিয়ে যেতে পারবে। আমার পীর আদর্শবাদী না মাংগু পীর, অথবা ফুজায়েল ইবনে আয়াজের মত ডাকাত কি না, সেই বিষয়টি এখানে ধর্তব্য নয়। কারণ আদর্শ ও প্রেম এক জিনিস নয়। আদর্শ দিয়ে আদর্শবাদী হওয়া যায় এবং প্রেম দিয়ে প্রেমিক হওয়া যায়। ইংল্যাণ্ডের এডওয়ার্ড ধোপার মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, যার দরুণ বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসতে পারেন নাই। সিংহাসনে বসাটা ছিল একটা নিরেট আদর্শ, আর সিংহাসনটি হাসিমুখে পরিত্যাগ করে ধোপার মেয়ে নিয়ে সংসার করাটা ছিল প্রেম। আল্লাহ্ বলেছেন, ‘কে আমাকে ভালবাসতে চায়? সে যেন আমার রসুলকে অনুসরণ করে।’ এখানে ভয় এবং সুন্নত শব্দটি নাই, বরং আছে হুব্বুল তথা প্রেম। এখানে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, অনুকরণ নয়। কারণ মহানবীকে পরিপূর্ণরূপে অনুকরণ করাটি সম্ভবপর নয়। সুতরাং অনুসরণ আর অনুকরণ এক বিষয় নয়। যিশুখ্রিস্ট যখন কাঁটায় বানানো মুকুট পরে নিজের ক্রুশ নিজেই বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক কিশোরি অবাক হয়ে বলেছিল, ‘প্রভু, এ কী দৃশ্য দেখছি আমি! কয়েক মাস আগে আমার নিকটাত্মীয় মৃত লেজারাসকে “জীবিত হও” বলার সঙ্গে সঙ্গে জীবিত হয়ে গেল। যিনি মৃতকে জীবিত করতে পারেন, যিনি অন্ধকে চক্ষুদান করতে পারেন, যিনি কুষ্ঠ রোগীকে ভাল করতে পারেন, যিনি মাটি দিয়ে বানানো পাখিটিকে ফুঁৎকার দিয়ে জীবন্ত করতে পারেন, তিনি কেন কাঁটার মুকুট পরিধান করে নিজের ক্রুশ নিজেই বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন!’ যিশুখ্রিস্ট তথা হজরত ঈসা (আ.) কিশোরিকে বললেন, ‘কন্যা, মানুষের সুরতে যারা অসুর তারা কোনোদিন দেবতাকে গ্রহণ করে নি, করে না এবং করবেও না। তাই আমি স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছি।’ ক্রুশে বিদ্ধ করার পর ইহুদি আলেম-ওলামারা একটি সাংঘাতিক যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছিল। বলেছিল, ‘আমরা নিজেরাই সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি মৃতকে জীবিত করতে পার; কিন্তু আজ আমরা তোমাকে শূলে চড়িয়েছি এবং এই শূল হতে যদি তুমি বেরিয়ে আসতে পার তাহলেই তোমাকে সত্য নবী বলে মেনে নিব। আর যদি আমাদের দেওয়া শূলীতেই তোমার মরণ হয়, তাহলে সত্য নবী বলে মানব না।’ কী সাংঘাতিক ধারালো যুক্তিপূর্ণ কথা। আজও এই যুগে যদি আমরা সেই স্থানে অবস্থান করতাম তাহলে কি ঐ ইহুদী আলেম-ওলামাদের ধারালো যুক্তির খপ্পরে পড়ে যেতাম না? কারণ ইহুদিদের শূলীতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। যিশু বেরিয়ে আসেন নি, কারণ ঐ শূল হতে বেরিয়ে আসলে আল্লাহর পরীক্ষাটির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। সুতরাং অবশ্যই যুক্তিতর্ক যেমন পথ দেখায় সে রকম কখনো কখনো বিভ্রান্ত করে। এই বিষয়টি বড়ই নাজুক বিষয়। খান্নাস জড়িত নফস এই নাজুক বিষয়টি সহজে মেনে নিতে চায় না।
মারেফতের বানী
ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী
















