Sufi meditation বা ধ্যান সাধনা
(২য় কিস্তি)
আমার সুরেশ্বরী বাবার শান কত বড় রে! আমার বাবা ভাণ্ডারীর শান কত বড় রে! আমার খাজা বাবার শান কত বড় রে! আমার বড় পীর গাউসুল আজমের শান কত বড় রে-এই কথাগুলো বলা অবশ্যই ভাল; কিন্তু ‘শান কত বড় রে’ বললেও শান আছে, না বললেও শান আছে। প্রশ্ন হলো, আমি কী পেলাম? আমি তো বকরির তিন নম্বর বাচ্চার মত দুধ না পেয়ে সারাটি জীবন লাফালাফি করে গেলাম। একটি বারের তরেও তো একশত বিশ দিনের একটি মোবাকাবার ধ্যানসাধনা করলাম না। কেবল একবস্তা সুফিবাদের কথাই শিখলাম, একবস্তা সুফিবাদের দলিল-দস্তাবেজ আয়ত্ব করলাম এবং বাহাসের মধ্য দিয়ে, কথা কাটাকাটির মধ্য দিয়ে হারিয়ে দিলাম, এবং মনে মনে আত্মতৃপ্তি পেয়ে বলতে লাগলাম, ‘আমি কী হনুরে!’ কিন্তু সুফিবাদের রহস্যলোকের বিন্দু বিসর্গও জানার আগ্রহটি প্রকাশ করলাম না। আগের দিনের পীর-ফকিরদের জীবনী পাঠ করলে দেখতে পাই যে, প্রতিটি পীর-ফকির বছরের পর বছর মোরাকাবার ধ্যানসাধনাটি করে গেছেন। অথচ আফসোস, অথচ বড়ই দুঃখের কথা যে, এই আধুনিক যুগের পীর-ফকিরেরা মোরাকাবার ধ্যানসাধনাটির কথা ভুলেও একবার উচ্চারণ করেন না। যথেষ্ট সন্দেহ করার অবকাশ থেকে যায় যে, এরা নিজেরাই মোরাকাবার ধ্যানসাধনাটি করেছেন কি না। নিজে না জানলে অপরকে জানাবে কেমন করে? তাই এত বড় মহাসত্য সুফিবাদটির দর্শন মানুষের মনে আর তেমন দাগ কাটতে দেখা যায় না। সৈনিক ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার নিয়ম-শৃংখল এদের মধ্যে যথেষ্ট পাওয়া যায়, কিন্তু মোরাকাবার ধ্যান সাধনার কথাটি দুরবিন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষ কিছু একটা ধরে রাখতে চায়, এটাই মানুষের স্বভাবধর্ম। উপযুক্ত পথের সন্ধান দিতে পারলে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গ্রহণ করে নেবার আগ্রহটি প্রকাশ করবে। মানুষ কোনো কিছু পাবার একটি নিশ্চয়তা চায়। কিন্তু নিশ্চয়তা দেওয়া তো দূরে থাক, নিজেরাই মোরাকাবার ধ্যানসাধনাটির বিষয়ে উদাসীন, না হয় তো অজ্ঞ। এরা সুফিবাদের ধারক বাহক হয়েও সুফিবাদের দর্শনটিকে বাকিতে বিক্রি করে, তথা মরে গেলে পাবার সুসংবাদটি দান করে। অথচ সুফিবাদের দর্শনটি হল একদম নগদ। তাই আজকাল আমরা সুফিবাদে বিশ্বাসীদের সঙ্গীতে বাকিতে পাবার বিলাপ শুনতে পাই : ‘মরণ কালে দয়াল দেখা দিও রে’, এ রকম তেলেসমাতি গান বিলাপ আর কান্নায় গেয়ে থাকে। অবশ্য এ কথাটিও অপ্রিয় সত্য যে, যাদের বুঝবার আন্তরিক আগ্রহটি নাই তাদেরকে শত বুঝালেও কোনো কাজ হবে না।

বিত্ত-বৈভবের মোহ যাদেরকে চন্দ্রগ্রহণ-সূর্যগ্রহণের মত গ্রাস করে ফেলেছে তাদের কাছে সুফিবাদের তো বহু দূরের কথা, ধর্ম বিষয়ের সাধারণ আদেশ-উপদেশগুলো কোনো কাজে আসে না। এরাই মানুষের সুরতে অসুর। এরাই সমাজের ভারসাম্য এবং শৃঙ্খলাকে ভেঙে চুরমার করেছেন। এরা প্যাঁচঘোচ দিয়ে কথা বলার ঝানু সৈনিক। এরাই গরিব-দুঃখী, এতিম-মিসকিনের হক মেরে দিতে সামান্য দ্বিধাও করেন না। এরাই গরিব-দুঃখীদের বুকের উপর পারা দিয়ে মিলাদ মাহফিলে যোগ দেয়। এরাই কাঁচা-গলা মোমের মত সহজ-সরল গরিব-মিসকিনদের জন্য দেওয়া ত্রাণসামগ্রী মেরে দিয়ে গুদামজাত করে। এরা মানুষের চেহারায় হিংস্র জানোয়ারের চেয়েও খারাপ। হিংস্র জানোয়ার সিংহ-বাঘের পেট ভরে গেলে বিশ্রাম নেয়, আর শিকার করে না। এরা হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েও গরিব-মিসকিনদের ত্রাণসামগ্রী লুণ্ঠন করে গুদামজাত করে। এদের অনেক আছে, কিন্তু এদের চাওয়ার শেষ নাই, এদের পাওয়ার শেষ নাই। পবিত্র কোরান এদের বিষয়ে বলছে, ‘তুমি কি সেই মানুষটিকে দেখেছ, যে ধর্মকে প্রথমে অস্বীকার করে? সে সেই মানুষটি, যে এতিম-গরিব-মিসকিন হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়’।

নফস তথা আমি পবিত্র। তখনই নফস অপবিত্র হয়, যখন খান্নাসরূপী শয়তানটি আমার মধ্যে অবস্থান করে। আমি + খান্নাসরূপী শয়তান = আমিত্ব/অহম/হাস্তি/খুদি/ইগো সেন্ট্রিসিটি। এই আমিত্বকেই পরিত্যাগ করার আদেশটির নাম কোরান শরীফ। কোরানে আদেশ-উপদেশের বিচিত্র ভঙ্গি ও শৈলী পাওয়া যায়। বিচিত্র আদেশ-উপদেশে, বিচিত্র কথা ও রূপকথার মাধ্যমে এই আমিত্বটিকে তাড়িয়ে দিয়ে একা হতে বলছে পবিত্র কোরান। চরম সত্যে এই একটি মাত্র আদেশ-উপদেশ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন আদেশ-উপদেশ নাই। ঘাট অনেক, নদী একটাই। স্বর্ণের অলংকার বহু, কিন্তু গলিয়ে ফেললে একই সোনা। দেশ ও জলবায়ুর প্রশ্নে গরুর আকার অনেক রকম, কিন্তু দুধ একই। বৈদিক যুগের মুনি-ঋষি হতে আজকের এই আধুনিক যুগের সুফিদের একই কথা, একই উপদেশ। কিন্তু উপদেশের ভাষা ও বাক্যের স্টাইল অনেক রকম। তাই এক কামেল পীরের যদি উপযুক্ত হতে পার, তাহলে সকল পীরের রহমতের দরজা তোমার জন্য খোলা থাকবে। যদি এক কামেল পীরের দৃষ্টিতে অনুপযুক্ত হও, তাহলে দেখতে পাবে, সকল কামেল পীরের রহমতের দরজা বন্ধ। কামেল পীরেরা অনেক ধ্যানসাধনা করার পর আল্লাহ্ পাকের বিশেষ রহমত অর্জন করতে পেরেছেন। সেই রহমতটি আর কিছুই নয়; কেবলমাত্র খান্নাসরূপী শয়তানটিকে তাড়িয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে রূহ তথা আল্লাহ্ স্বয়ং রবরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তখন নফসটি হয়ে যায় রূহ-এর বাহন মাত্র। নফস মোতমায়েন্না হবার পর আরও যদি ঊর্ধ্বস্তরে গমন করতে পারে, এবং পরিশেষে চরম পর্যায়েও অবস্থান নেয়, তবু নফস সৃষ্ট; তথা প্রতিটি মানুষ যদি ঊর্ধ্বজগতে বিচরণও করে, তবু সে সৃষ্ট। কারণ নফস সৃষ্ট, কিন্তু রূহ সৃষ্ট নয়। রব আল্লাহর আদেশ তথা আল্লাহ্ স্বয়ং। চন্দ্রগ্রহণ-সূর্যগ্রহণের মত যখন মানবীয় নফসটিকে রূহ তথ্য আল্লাহ্ সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলে, তখন নিজেকে আর দেখতে পান না। তখনই সাধক বলে ফেলেন, ‘আনাল হক’ তথা আমিই সত্য। তখনই শ্ৰীশ্ৰী চৈতন্যদেব বলে ফেলেন, ‘তুই মুই, মুই তুই’ তথা তুইই আমি, আমিই তুই। এই দর্শনটিকে পবিত্র কোরান এভাবে বলছে যে, ‘আপনি পাথর ছুড়ে মারেন নি বরং আমিই ছুড়ে মেরেছি। ওটা আপনার হাত নয়, বরং ওটা আমার হাত।’ যদিও মানবীয় সত্তাটি সৃষ্ট এবং আল্লাহ্ পাকের সর্বশ্রেষ্ঠ সেফাত তথা গুণ, সেফাত কখনো জাত নয়, বরং জাত হতে সেফাতের আগমন। তাই বলা হয়ে থাকে, মানুষ আল্লাহ্ নয় : আবার আল্লাহ্ হতে আলাদাও নয়। ডালিম গাছ নয় : আবার গাছ হতে আলাদা নয়। পবিত্র বোখারি শরিফেও বলা হয়েছে যে, বান্দা নফল এবাদত করতে করতে আল্লাহর এত নিকটে এসে পড়ে যে, বান্দার জবান আল্লাহর জবান হয়ে যায়; বান্দার চোখ আল্লাহ্ চোখ হয়ে যায় এবং সেই চোখে দেখে; বান্দার কান আল্লাহর কান হয়ে যায় এবং সেই কানে শ্রবণ করে; বান্দার হাত আল্লাহর হাত হয়ে যায় এবং সেই হাতে কর্ম করে; বান্দার পা আল্লাহর পা হয়ে যায় এবং সেই পা দিয়ে হাটে। যদিও চরম সত্যে বান্দা সেফাত, জাত নয়, তবু সেফাতের মধ্যে জাত আপনরূপে উদ্ভাসিত হতে পারে; কিন্তু জাতের মধ্যে সেফাতের অবস্থানটি হয় না। ইহা একটি সূক্ষ্ম বিষয়। ইহা একটি চিকন চিন্তা। ইহা একটি রহস্যলোকের কথা, যা সবার পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভবপর নয়। মহানবী রহমাতুল্লিল আল আমিন তথা সমস্ত আলমের রহমত, তাই মহানবী সবারই শিক্ষা ও দীক্ষার মহাগুরু। যারা এই ঊর্ধ্বলোকের বিষয়টি অবগত নয় তথা বুঝতে পারে না তাদেরকেই মহানবী সৈনিক-ধর্ম পালনের প্রেসক্রিপশন তথা ব্যবস্থাপত্রটি রহমতরূপে দিয়ে গেছেন। পাঠশালার শিক্ষা, স্কুলের শিক্ষা, কলেজের শিক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-সবই শিক্ষা, তবে প্রকারভেদ অবশ্যই আছে। কোন শিক্ষাকেই খাটো করে দেখার অবকাশ নাই। প্রতিটি সেফাত তথা গুণ জাত হতে আগমন করেছে। এমনকি একটি ধুলিকণাও আল্লাহর সেফাতের সেফাত হয়ে অবস্থান করছে। আল্লাহ্ ছাড়া কোনো অস্তিত্বই নাই। অস্তিত্ব না থাকাটাই একটি বিরাট শূন্য। শূন্য যোগ শূন্য সমান সমান শূন্য। আধুনিক বিজ্ঞান অস্তিত্ববিহীন কিছুরই অবস্থান থাকতে পারে না বলে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছে। তাই বলা হয়েছে, ‘ওয়াহাদাহু লা শরিকা লাহু।’ তথা তিনিই একমাত্র এবং তার কোন শরিক নাই। সামান্য একটি ধূলিকণাও যদি বলে ফেলে যে, আমি যতই ক্ষুদ্র হই না কেন, আল্লাহর অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বাহিরে অবস্থান করছি, তাহলে ধুলিকণা যতই ক্ষুদ্র হউক না কেন আল্লাহর সঙ্গে শেরেক করছে। তাই আল্লাহ্ লা শারিকা লাহু। সুতরাং আল্লাহ্ পাক যেমন ওয়াহেদ তথা এক, তেমনি আবার আহাদও, তথা স্বয়ম্ভু। ইউরোপীয় দার্শনিকেরা আল্লাহর এই স্বয়ম্ভু রূপটির রহস্য অনুধাবন করতে না পেরে আল্লাহকে পৃথকরূপে দেখার দর্শনটি প্রচার করে। দার্শনিক কান্ট, হেগেল, বার্গস, দেকার্তে এ রকম ভাবেই আল্লাহর পরিচয়টি প্রকাশ করতে চেয়েছেন।
যতটুকু উপলব্ধি, ততটুকুই বৃত্ত। উপলব্ধি যত বড়, বৃত্তটিও ততই বড়। সুতরাং চরম সত্যে গালি নাই। তাই কোরান বলছে যে, যে যতটুকু বোঝা বহন করার উপযুক্ত তাকে তার বেশি বোঝা দেওয়া হয় না। মত ও পথের বিভিন্নতা আছে বলেই জ্ঞানরাজ্যে যে রকম সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তেমনি অনেক রকম বিভ্রান্তিও দেখা দেয়। কুলি-মজুর, কামার-কুমার, তাঁতি-জেলে হতে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার-বিজ্ঞানী-দার্শনিক সবাইকে আল্লাহ্ পাকের একটি অদৃশ্য সুতার মধ্যে বেঁধে রাখা হয়েছে। আল্লাহর এই লীলাখেলা বৈচিত্র্যে ভরপুর। তাই আল্লাহ্ নিজেকে নব নব রূপে সেফাতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে যাচ্ছেন।
মারেফতের বানী
ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী
















