হোম পেজ মুক্ত চিন্তা ইসলামিক জীবন দর্শন ধর্মীয় দর্শনের পটভূমি | বিজ্ঞানী গ্যালিলিও থেকে আল্লামা ইকবাল | Baba Jahangir

ধর্মীয় দর্শনের পটভূমি | বিজ্ঞানী গ্যালিলিও থেকে আল্লামা ইকবাল | Baba Jahangir

5
0
Baba Jahangir BD
Baba Jahangir BD

ধর্মীয় দর্শনের পটভূমি
[ বিজ্ঞানী গ্যালিলিও থেকে আল্লামা ইকবাল ]

খৃষ্টান ফাউন্ডেশন বলতে বোঝায়, খৃষ্টান ধর্মের সব বড় বড় আলেম এবং খৃষ্টান ধর্ম বিষয়ে মহা বিশারদ ও মহাজ্ঞানীদের ঐক্যমতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কারণ ধর্ম বিষয়ে যারা সব চাইতে বড় বড় মহাজ্ঞানী তারাই খৃষ্টান ফাউন্ডেশনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর বিচার হচ্ছে এই জাতীয় খৃষ্টান ফাউন্ডেশনের ধর্ম বিষয়ে মহা মহা জ্ঞানীদের দ্বারা। অভিযোগটি মারাত্মক ও বিরাট গুরুতর। কারণ এমন আজগুবি, বানোয়াট মনগড়া (?) কথা বিজ্ঞানী গ্যালিলিও জনগণের কাছে প্রচার করেছেন যা কেউ কোন দিন শোনে নি এবং কল্পনাও করে নি। সেই কথাটি হল, বিজ্ঞানী গ্যালিলিও বলছেন যে, সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরছে। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘোরে না।

মারাত্মক অভিযোগ (!) বিচার করছেন খৃষ্টান ফাউন্ডেশনের বড় বড় আলেমরা। অতি সংক্ষেপে বলতে হচ্ছে, বিচারের রায়, ঘোষণা করলেন খৃষ্টান ফাউন্ডেশন, বিজ্ঞানী গ্যালিলিও ধর্মদ্রোহী, আমাদের ভাষায় মুরতাদ তাই ফুটন্ত তৈলে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। বিচারকের কাঠগড়ায় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও দাঁড়িয়ে মহাজ্ঞানীদের বিচারের রায় শুনছেন আর বোবার মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছেন। তবে রায় ঘোষণার শেষে একটি অনুচ্ছেদ জুড়ে দেওয়া হলো এই বলে যে, যদি বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং জীবনে এরকম মনগড়া কু-কথা আর ভুলেও মুখে উচ্চারণ করবেন না তাহলে ক্ষমা পাবার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর শিষ্যরা জীবন বাঁচানোর জন্য গুরুকে বারবার অনুরোধ করায় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও অবশেষে খৃষ্টান ফাউন্ডেশনের ধর্ম বিষয়ে মহাজ্ঞানীদের সামনে বিড়বিড় করে বললেন যে, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরছে। আর কি! খৃষ্টান ফাউন্ডেশনের ধর্ম বিষয়ে মহাজ্ঞানীরা মারহাবা মারহাবা বলে বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে সামান্য শাস্তি তথা বলতে গেলে ক্ষমা করে দিলেন এবং সাবধান করে দিলেন এই বলে যে, তোমরা জেনে রাখ যে, পৃথিবীটা সমস্ত নিখিল সৃষ্টির মাঝখানে স্থির হয়ে বসে আছে আর চাঁদ-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র এ সবই পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে। তোমরা জান যে, এর আগে ১৫৬৫ তে খৃষ্টান ফাউন্ডেশনের জ্ঞানীগুণীরা জরদানো ব্রুনোকে এরকম জঘন্য (?) কথা বলার দরুন বিচার করে আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল। এর আগে নিকোলাস কোপারনিকাস এবং এরও আগে দেজিদেরিয়াস ইরজমাসকে শাস্তি দিয়েছিল। তোমাদেরকে বারবার সাবধান করে দিচ্ছি যেন আর কেউ এদের মত ধর্ম-বিরুদ্ধ কথা না বলো। হায়রে সেই দিনের খৃষ্টান ফাউন্ডেশন আর সেই দিনের ধর্ম বিষয়ে বড় বড় জ্ঞানীদের জ্ঞানের বহর! এ যুগে ধর্মের নামে এরকম কত জনকে যে শাস্তি পেতে হয়েছে চিন্তা করলে মন শিউরে উঠে। ধর্মের উপর বিশ্বাস ভাঙ্গার জন্য দায়ী কারা ছিল? অবশ্য অনেক পরে খৃষ্টান আলেমেরা বিজ্ঞানীদের হাতের চড়, লাথি, গুতা খেতে খেতে মরা সাপের মত সোজা হতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা যত এগিয়ে যাবে ততই এদের হাক্কি-ধাক্কি লাফালাফি কমে আসবে। আবার এটাও সত্য, সত্যধর্ম বিজ্ঞানের বন্ধু আর কুসংস্কার কিছুদিনের জন্য শত্রুরূপ ধারণ করে পরে আপনি বসন্তের আগমনে গাছের পাতা ঝরার মতো শত্রুতার পাতাগুলো প্রকৃতির নিয়মে আপনিই ঝরে পড়ে।

মীর জাফর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, আধা হাত লম্বা সুন্নতি দাড়ি রেখে পবিত্র কোরান স্পর্শ করেও নবাব সিরাজের সাথে বেঈমানি করলো। পলাশীর মাঠে নবাব সিরাজ পরাজয় বরণ করলেন। বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যা বৃটিশ শাসক ক্লাইভের পেটে চলে গেল। এভাবে বৃটিশের ঠাণ্ডা মাথার চালবাজির কাছে একে একে সবাই পরাজয় বরণ করলো। তারপর ভারতের শেষ ভরসা ছিল মহীশূরের নবাব টিপু সুলতান। বৃটিশকে বারবার প্রতিটি যুদ্ধে হারিয়ে দিলেন টিপু সুলতান। কিন্তু অতি আপনজন মীর সাদিকের বেঈমানীর দরুণ দূর্গের গোপনীয় ভাঙ্গাপথ দিয়ে যখন বৃটিশ সৈন্যরা ঢুকে পড়লো তখন নবাব টিপু সুলতান মুখোমুখি যুদ্ধ করে শহীদ হলেন। সমগ্র ভারত তখন পরাধীনতার অসহ্য গ্লানি নিয়ে বৃটিশের শাসনে চলে গেল। এত বড় বিশাল ভারত পরিণত হলো বৃটিশের উপনিবেশে। আজও মহীশূরের মুসলমানেরা মীর সাদিকের নামটিকে বেঈমানীর প্রতীক মনে করে সন্তানদের নাম রাখেন না। যেমন বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় মীর জাফরকে বেঈমানীর প্রতীক মনে করে সন্তানদের নাম রাখেন না। দুইশত বছর ভারতবাসীকে বৃটিশের গোলামী খাটতে হলো। সেই বৃটিশ শাসনের সময় ভারতের বুকে যে কয়জন মনীষীর জন্ম হয়েছিল তাদেরই একজন মহাকবি আল্লামা ইকবাল। সমগ্র ভারতবাসী এবং বিশেষ করে মুসলমান জাতিকে নতুন উদ্যমে জাগিয়ে তোলার জন্য কলম ধরলেন। জিলেট ব্লেডের চকচকে ধারের মতো তাঁর লিখনি। একদিকে কবি, অন্যদিকে দর্শন, আরবী ও ফারসী ভাষায় ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করে পৃথিবীকে বুঝিয়ে দিলেন যে, কোন কবি তিনটি বিষয়ে পি.এইচ, ডি নিতে পারেন নি। আর তিনি সেই দিনের জার্মানের বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন।

মহাকবি আল্লামা ইকবালকে সেই দিনের বৃটিশ শাসিত ভারতের কিছু সংখ্যক মোল্লাদের বিচার-এর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। প্রায় হাজার খানেক আলেম নামক মোল্লা আল্লামা ইকবালকে কাফের ফতোয়া দিয়েছিল এবং এটা কমবেশি সবারই জানা থাকার কথা। এটাও জানা থাকার কথা যে, যে এক হাজার মোল্লা কাফের ফতোয়া দিয়েছিলো তার মধ্যে দেওবন্দের হোসাইন ইবনে মাদানীই ছিলেন প্রথম। আল্লামা ইকবাল তাই দুঃখ করে হোসাইন ইবনে মাদানীতে মহানবীর চাচা আবু লাহাবের গন্ধ পাবার কথাটি ফারসী ভাষায় লিখে গেছেন। আবু লাহাব কাফের হলেও মহানবীর বংশের। তাই আবু লাহাবের গন্ধ পেলেন আল্লামা ইকবাল। তাই বললেন-“হোসাইন ইবনে মাদানী ই চেঁ হুঁ আবু লাহাবিস্ত। ” তাঁর অপরাধ ছিল ‘শেকোয়া’ নামক কবিতার বইতে আল্লাহকে একশত প্রশ্ন করেছিলেন। এটাই মোল্লারা ধরে নিয়েছে আল্লাহর বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ। রূপক ভাষায়ও বলতে চাই না যে, সেদিনের মোল্লাদের তৈরি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এর মতো আল্লামা ইকবালকে কাফের ফতোয়ার শেষ অস্ত্রটি ব্যবহার করেছিল। আল্লামা ইকবালের বিরুদ্ধে কাফের ফতোয়া দেবার পেছনে কিছু পটভূমি তথা শানে নযুল আগেই তৈরি হয়েছিল। মাত্র দুইটি পটভূমি তথা শানে নযুল বর্ণনা করেই মূল বিষয়টিতে চলে যাবো। একবার আল্লামা ইকবাল গুণীজনের সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে কয়টি সাংঘাতিক কড়া কথা বলে ফেলেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দিলেন এই বলে যে, “আমার আন্তরিক সালাম আলেমদের কাছে পৌছে দিন এবং এই শ্রদ্ধেয় আলেমেরা যে কোরানের তফসির তথা ব্যাখ্যা লিখেছেন সেই কোরানের তফসির তথা ব্যাখ্যা দেখে আল্লাহ্ রসূল এবং ফেরেস্তারা সবাই তাজ্জব। এই আলেমেরা কি সূরা কাহাফ্ এর ১০৯ নম্বর আয়াত এবং সূরা লোকমানের ২৭ নম্বর আয়াত ভালো করে বারবার পড়েন নি?” সেই দিনের অনেক আলেমই ইকবালের এরকম কথা শুনে কিছু বলার মতো সাহস না পেয়ে মনে মনে রাগে গর গর করেছে। না পারে বলতে, না পারে সইতে। কারণ ইকবালতো কেবল ইকবাল নয়। তিনি আল্লামা। আলেমদের আলেম। আজকাল তো অনেক স্বঘোষিত ‘আল্লামা’ আর ‘শায়খুল হাদিস’ নামের আগে দেখা যায়। আল্লামা হবার যোগ্যতার মানদণ্ড না থাকলেও কিছু আসে যায় না। সরল এবং সাধারণ মানুষ এসব বিশ্লেষণের রহস্য অনুধাবন করতে চায় না।

-সুফিবাদ আত্মপরিচয়ের একমাত্র পথ (১ম খণ্ড)

চেরাগে জান শরীফ
ডা.বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here