অনেকেই গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে মু’মিনের শাসন কায়েম করতে উপদেশ দিয়ে থাকেন। উপদেশটি অবশ্যই ভাল। কিন্তু উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খলিফারা তো মু’মিনদের মু’মিন খেতাব খানা গলায় ঝুলিয়ে যত প্রকার অপকর্ম এবং নিজেদের মনগড়া মতবাদ ইসলামের দোহাই দিয়ে জোর করে চালিয়ে দিয়েছে। কোন প্রতিবাদ, কোন স্বাধীন সমালোচনা করার সামান্যতম স্বাধীনতাটুকু সহ্য করা হতো না বরং নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। যদি বাক্ স্বাধীনতাটুকু ছিনিয়ে নেয় তো মানুষের প্রতিভা বিকাশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ জড়পদার্থে পরিণত হয় এবং গবেষণা করার কোন পথ আর খোলা থাকে না। এই দুই রাজবংশ কি মু’মিনদের মু’মিন বলে ঘোষণা করে এরকম অপকর্ম করেনি? এমন কোন একটি মুসলমানের সাহস কি ছিল এদের বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিবাদটুকু করার? খলিফাদের তরফ থেকে উত্তর আসবে যে, হাজার হাজার আলেম উলামা মুফতি মাওলানারা আমাদেরকে মু’মিনদের মুমিন বলে কোরান হাদীসের দলিল দিয়ে প্রমাণ করেছেন। তোমরা তো অতি সাধারণ মানুষ।
তোমরা আলেম উলামাদের মরতবা কেমন করে বুঝতে পারবে? তবু একদম থেমে থাকেনি। মুসলমানদের মধ্যে কিছু কিছু প্রতিভা প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু যদি গণতন্ত্র থাকতো, বাকস্বাধীনতা থাকতো, সবার মতামত প্রকাশ করার স্বাধীনতা থাকতো, তা হলে বহু প্রতিভার জন্ম হত। আজ আমরা কেন এত লজ্জাজনকভাবে পেছনে পড়ে থাকবো? এর জন্য অন্য কেউ দায়ী নয় বরং আমরাই আমাদের ভাগ্যটিকে পরিবর্তন করার সুযোগ পাইনি। এই সব মু’মিনদের মু’মিন বলে কথিত খলিফারা সেই সুযোগটিকে বিদ্রোহ নামক ফতোয়া দিয়ে দমন করে গেছে। ইসলামের হিটলার হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তো লক্ষের উপর মুসলমানদের নির্মমভাবে খুন করেছে বাক্ স্বাধীনতার ভয়ে। সামান্য সন্দেহ হলেই খুন করেছে হাজ্জাজ।
মহান সাহাবা হযরত আনাসের পুত্রকে একদম অকারণে খুন করার পরও অনেকেই মর্মাহত হয়েছেন কিন্তু টু শব্দটি কেউ করার সাহস করেনি। হাজ্জাজ যে ইসলামের কত বড় ক্ষতি সাধন করে গেছে সেটা ইতিহাস পড়লেই জানা যায়। অথচ সেই হাজ্জাজকেও মু’মিন বলে আলেম উলামারা ফতোয়া দিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ হাজ্জাজ সর্বপ্রথম কোরানে জের, জবর, পেশ, ছোট মদ দিয়ে গেছে। আজো যে মুসলিম দেশে কট্টর রাজতন্ত্র বিরাজ করে অথবা গণতন্ত্রের নামে হাঁ না ভোটে একশত ভাগ ভোট পেয়ে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত হয়, সে দেশে বাক স্বাধীনতার প্রশ্নই উঠে না। অথচ কোরান কি বলছে সেটা কি এরা ভেবে দেখার সুযোগ পেয়েছে? আল্লাহ্ যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে কেউ অবিশ্বাসী থাকতো না। বরং সবাই বিশ্বাস করতো এবং অবিশ্বাস বলে কোন শব্দ আল্লাহর উপর আরোপ করার প্রশ্নই থাকতো না। কারণ আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। এটা সবারই জানা। নূতন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।
আল্লাহ্ ঈমান আনা না আনার উপর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন তাঁর বান্দাদের। আর স্বাধীনতা দিতে গেলেই বিশ্বাসের সঙ্গে অবিশ্বাস থাকতে বাধ্য। তাই অবিশ্বাসীদেরকে গণতান্ত্রিক অধিকার হতে বঞ্চিত করার বিধান নেই। এমন কি কোরান এদেরকে ঘৃণা করতেও বারণ করেছে। কারণ এরাই হয়তো মুসলমানদের আচার আচরণে মুগ্ধ হয়ে একদিন ঈমান আনতেও পারে এবং ইসলামকে ধর্ম হিসাবে মেনে নিতে পারে। ভারতবর্ষে আজ হতে প্রায় আটশত বছর আগে চার কোটি লোকের বাস ছিল। জৈন, পারশি, হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্মের এই চার কোটি মানুষের মধ্যে নব্বই লক্ষ লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে খাজাবাবার উসিলায়।
কোরানের সূরা ইউনুসের নিরানব্বই নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন, “ওয়ালাও শাআ রাব্বুকা লা আমানা মান্ ফিল আরদে কুলুহুম জামিয়ান, আফা আন্তা তুরেহুন নাসা হাত্তা ইয়াকুনু মুমিনিনা।” “এবং তোমার রব যদি ইচ্ছা করতেন তাহলে পৃথিবীর মধ্যে হতে সমস্ত কিছুই অবশ্যই ঈমান আনতো, তবে কি তুমি মানুষদেরকে অপছন্দ করবে? মোমেন না হওয়া পর্যন্ত। ” তাছাড়া অন্য মানুষ তো দূরে থাক জগতের এমন কোন মানুষের পক্ষেই ঈমান আনা অসম্ভব যদি না তাতে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সম্মতি থাকে। অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ ছাড়া কারো পক্ষেই বিশ্বাসীর দলভুক্ত হওয়া যায় না। তাই একই সূরা ইউনুসের একশত নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন, “ওয়ামা কানা লে নাফসিন আন তু’মেনা ইল্লা বেইজনিল্লাহে।” “এবং কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় আল্লাহর হুকুম ছাড়া ঈমান আনা। ” আল্লাহ্ হতে সত্যের আগমন। মিথ্যা হতে সত্যের আগমন অসম্ভব। কারণ সত্য পবিত্র।
আল্লাহ্ পবিত্রতা পছন্দ করেন। যেহেতু সত্য পবিত্র সেই হেতু আল্লাহ্ হতেই সত্যের আগমন। যার ইচ্ছা হয় ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা হয় কুফুরি করুক। এতে আল্লাহর কিছুই যায় আসে না। তাই কোরানের সূরা কাহাফের উনত্রিশ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “ওয়া কুলিল, হাকুমের রাব্বেকুম ফামান শাআ ফাল্টউমেন ওয়া মান শাআ ফাল্ ইয়াকফুর। ”“এবং বল, সত্য তোমাদের প্রতিপালক (রব) হতে। সুতরাং যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে, অতএব, সে ঈমান আনুক এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে অতএব কুফুরি করুক। ”
[ সুফিবাদ আত্মপরিচয়ের একমাত্র পথ ]
-ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী













